নবম শ্রেণির ১৮তম সপ্তাহের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় অ্যাসাইনমেন্ট উত্তর – ভিডিও সহ

 

নবম শ্রেণির ১৮তম সপ্তাহের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় অ্যাসাইনমেন্ট উত্তর    :   ৬ষ্ঠ/৭ম/৮ম/৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ১৮ তম সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট

১৮ তম সপ্তাহের ৬ষ্ঠ,৭ম, ৮ম, ৯ম শ্রেণির এসাইনমেন্ট ২০২১


প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী বন্ধুরা, কেমন আছ সবাই? আশা করি সবাই ভালো আছ। বরাবরের মতো, প্রতি সপ্তাহে তোমাদের জন্য ১৮ তম অ্যাসাইনমেন্ট উত্তর ৬ষ্ঠ,৭ম,৮ম,৯ম ও ১০ম শ্রেণির অ্যাসাইনমেন্ট প্রকাশের পরে আমরা অবিলম্বে ষষ্ঠ,৭ম, অষ্টম, নবম শ্রেণির উত্তর ২০২১ প্রকাশ করছি। আজকের পোস্টে, আমি তোমাদের ষষ্ঠ,৭ম,৮ম,৯ম শ্রেণির ১৮তম সপ্তাহের এসাইনমেন্ট প্রশ্ন ও উত্তর শেয়ার করবো। ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম ও ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ১৮তম সপ্তাহের এ্যাসাইনমেন্ট।

Covid-19 মহামারীর কারণে এবছরের জুলাই মাসের শেষের চলমান নির্ধারিত কাজ (এসাইনমেন্ট) কার্যক্রম স্থগিত করা হয় এবং পরবর্তীতে অগাস্ট মাসের ১১ তারিখে পূণরায় এ্যাসাইনমেন্টের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ২০২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার ধারা বজায় রাখার জন্য পূণরায় ৬ষ্ঠ,৭ম,৮ম ও ৯ম শ্রেণির বিভিন্ন বিষয়ের উপর এসাইনমেন্ট গ্রহন করার প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।

 

নবম শ্রেণীর ১৮তম সপ্তাহের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এসাইনমেন্ট


কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের সামাজিকীকরণকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? এধরনের প্রভাবকে ইতিবাচকভাবে কার্যকর করার উপায় উল্লেখ কর।

নির্দেশনা (সংকেত/ধাপ/পরিধি):
১. সামাজিকীকরণের ধারণা ব্যাখ্যা করবে।

২. সামাজিকীকরণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উল্লেখ করবে।

৩. কী কারণে সামাজিকীকরণে বর্তমান পরিবেশ প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করছে তা উল্লেখ করবে।

৪. চলমান পরিস্থিতিতে সামাজিক জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনগুলাে উল্লেখ করবে (এজন্য পত্রপত্রিকা/ অনলাইন মাধ্যমে ব্যবহার করতে পারে)।

৫. এ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণও নিজস্ব পর্যবেক্ষণ/ মতামত প্রদান করবে।

৬. উপসংহার।

 

নবম শ্রেণীর ১৮তম সপ্তাহের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এসাইনমেন্ট উত্তর


এসাইনমেন্ট শিরোনাম: কোভিড-১৯ পরিস্থিতি আমাদের সামাজিকীকরণকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? এধরনের প্রভাবকে ইতিবাচকভাবে কার্যকর করার উপায় উল্লেখ কর।

১৮ তম সপ্তাহের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় অ্যাসাইনমেন্ট উত্তর


সামাজিকীকরণের ধারণা:

একজন ব্যক্তিকে সমাজে অন্তর্ভুক্ত করার নামই হচ্ছে সামাজিকীকরণ। সামাজিকীকরণ একটি শিক্ষণ প্রক্রিয়া যা জন্মের পরেই শুরু হয়। অর্থাৎ সামাজিকীকরণ হল একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি মানুষের আচরণের প্রচলিত নিদর্শনগুলি অর্জন করে। প্রতিটি ব্যক্তি নিজেকে সেই পরিস্থিতি ও পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য করার চেষ্টা করে যা মূলত সমাজের দ্বারা নির্ধারিত হয় যার দ্বারা সে একজন সমাজীক জীব বা সদস্যে পরিণত হয়। তাছাড়া সামাজিকীকরণ হল কোনো ব্যক্তির সংস্কৃতি জানার প্রক্রিয়া এবং এর মধ্যে কীভাবে বাঁচতে হয় তা শিখতে পারে।

অগবার্ন(Ogburn) এর মতে:

”সামাজিকীকরণ হল একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তি গোষ্ঠীর নিয়ম মেনে চলতে শেখে।”

কলে(Colley) এর মতে:

”সামাজিকীকরণ একটি সামাজিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি নিয়মগুলি শিখার মাধ্যমে এবং অন্যের কাছ থেকে নিজের স্ব সম্পর্কে জেনে নিজের স্বভাব বিকাশ করে।”

যে প্রক্রিয়ায় জন্মের পর থেকে মানবশিশু সমাজের নিয়মকানুন ও রীতিনীতি শিখতে থাকে, সেই প্রক্রিয়াকেই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বলে।

একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে কোনও সংস্কৃতি ছাড়াই জন্মগ্রহণ করে। তাকে ধীরে ধীরে সমাজে গোষ্ঠীগুলির দ্বারা একটি সামাজিক সত্তায় রূপান্তরিত করা হয়। শৈশব হল একটি শিশুর সবচেয়ে তীব্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিকীকরণের সময়কাল। অনুকরণের মাধ্যমে একটি শিশু অনেকগুলি সামাজিক আচরণের ধরণগুলি শেখে। ভাষা এবং উচ্চারণ শিশু কেবল অনুকরণের মাধ্যমে অর্জন করে। বাচ্চা বয়সে বড় হওয়ার সাথে সাথে শিশু তার প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারে যা তার চাহিদা পূরণ করে এবং অন্যান্য বিষয়গুলো জানার মাধ্যমে একটি শিশু সনাক্তকরণের প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পায়।

সামাজিকীকরণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা:

প্রত্যেক সমাজের কিছু নিয়ম-রীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও আদর্শ রয়েছে। মানুষকে এগুলো আয়ত্ব করতে হয়। সমাজের এই নিয়ম-রীতি আয়ত্ব করার প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সামাজিকীকরণ। এরমধ্যে দিয়েই ব্যক্তি সমাজের নিয়ম-রীতি ও প্রত্যাশিত আচরণের উপযোগী হয়ে গড়ে উঠে। সামাজিকীকরণ অঅসলে একটি চলমান প্রক্রিয়া। শৈশব থেকে মৃত্যু অবধি এটা চলতে থাকে।

সামাজিকীকরণে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব:

ব্যক্তির সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সামাজিকীকরণ প্রয়োজন। জন্মের পর থেকেই মানব শিশু সমাজের নিয়ম-কানুন ও রীতি-নীতি শিখতে থাকে। একেই বলার যায় তার সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। এই অধ্যায়ে আমরা সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে কয়েকটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে জানব।

পরিবার:

সামাজিকীকরণের প্রথম ও প্রধান বাহন পরিবার। পরিবারে বসবাস করতে গিয়ে শিশু পরিবারের সদস্যদের প্রতি আবেগ, অনুভূতি, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জাগিয়ে তোলে। খাদ্যাভাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, ধর্মচর্চা, শিক্ষাগ্রহণ ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে পারিবারিক সংস্কৃতির প্রতিফলন সরাসরি ব্যক্তির উপর পড়ে। এজন্যই বলা হয় সামাজিকীকরণের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বাহন হচ্ছে পরিবার।

স্থানীয় সমাজ:

বাবা-মা বা পরিবারের পর স্থানীয় সমাজই শিশুর সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন। চারপাশের মানুষের আচার-আচরণ ও রীতিনীতি দেখতে দেখতে শিশু বেড়ে উঠে। এভাবে সে সহজেই সমাজের রীতিনীতি শিখে যায়।স্থানীয় মানুষের ভাষাভঙ্গি ও মূল্যবোধ তার আচরণে প্রভাব ফেলে।

স্থানীয় সমাজের বিভিন্ন উপাদান:

স্থানীয় সমাজের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে রয়েছে সাহিত্য সমিতি, সাংস্কৃতিক সংঘ, খেলাধূলার ক্লাব, সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্র, বিজ্ঞান ক্লাব প্রভৃতি। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা এসব সংগঠন ব্যক্তির চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও আচার-আচরণের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। ব্যক্তি এসব সংগঠনের সঙ্গে নিজেকে জড়ায়। সংগঠনভুক্ত অন্যদের সঙ্গে মিশে তার বুদ্ধিবৃত্তি, সুকুমার বৃত্তি ও সৌন্দর্য বোধ জেগে উঠে। এই বোধ তাকে সহনশীল হতে শেখায়। এভাবেই ব্যক্তি স্থানীয় সমাজের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ায় এবং তাদের অংশ হয়ে উঠে।

সমবয়সী সঙ্গী:

শিশুর সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে সমবয়সী বন্ধু বা সঙ্গীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শৈশবে সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধূলার আকর্ষণ থাকে অপ্রতিরোধ্য। এভাবে খেলার সাথিরা একে অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে। কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও চালচলনের ক্ষেত্রে তারা একে অন্যকে প্রভাবিত করে। এর মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সহনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণগুলো বিকশিত হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান:

বিভিন্ন ধরনের শিক্ষালয়ের শিক্ষার্থীরা পরষ্পরের সাথে মিলিত হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে একে অপরকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। এসব শিক্ষালয় সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান:

রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব এবং আন্দোলন সংগ্রামও ব্যক্তির সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করার মাধ্যমে তারা এ কাজটি করে।

কী কারণে সামাজিকীকরণে বর্তমান পরিবেশ প্রতিবন্ধক হিসাবে কাজ করছে: সামাজিকীকরণ সমাজতাত্ত্বিক ও মনোবৈজ্ঞানিক একটি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় একজন ব্যক্তিকে তার জন্মের পর থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার প্রয়োজনে অনেক কিছু শিখতে হয়। এ শিক্ষণ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে বাবা-মা, পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, খেলার সাথী ও সমবয়সি দল, বন্ধু, প্রতিবেশী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, কর্মস্থান এবং চেনা-অচেনা অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন।

এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি তার নিজস্ব ভাষা, পারিবারিক নিয়ম-কানুন, আদব-কায়দা, আচার-আচরণ, সামাজিক রীতিনীতি, সামাজিক শৃঙ্খলা, প্রথা-পদ্ধতি, মূল্যবোধ ইত্যাদি আয়ত্ত করে সমাজের উপযোগী একজন সদস্য হয়ে ওঠেন। জীবনব্যাপী চলতে থাকা এ শিক্ষণ প্রক্রিয়াকে সামাজিকীকরণ বলে। সামাজিকীকরণ যথাযথ না হলে শিশু বা ব্যক্তির মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সে ক্ষেত্রে সে অনেক অসামাজিক আচরণ করতে পারে। ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম ঘটলে তার প্রভাব সমাজের ওপর পড়ে।

করোনাকালে ব্যক্তি, বিশেষ করে শিশু-কিশোর-কিশোরী ও ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে সামাজিকীকরণের যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, বিগত প্রায় ৯০ বছরের মধ্যে এমনটি ঘটেনি। করোনাভাইরাস পৃথিবীব্যাপী মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিক পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এ রোগের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, স্বাস্থ্যগত ও মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত নিয়ে ইতোমধ্যে অনেক গবেষণা হয়েছে। তবে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ওপর এর অভিঘাত নিয়ে এখনো কোনো গবেষণা হয়েছে বলে জানা নেই।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা, প্রকাশিত সংবাদ ও সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে বলা যায়, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, লকডাউন বা শাটডাউন ঘোষণা, অফিস-আদালতসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার কারণে অনেকেই ঘরে থাকতে বাধ্য। অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে, অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। এসব থেকে সৃষ্ট ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও মানসিক চাপের বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবার ও ছেলেমেয়েদের ওপর। দেশে শিশু-কিশোর ও ছাত্রছাত্রীদের ওপর সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার যে চ্যালেঞ্জগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলো হলো-

   ১. যেসব মাধ্যমে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া সাধিত হয়, তার মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম পরিবার। পরিবারেই শিশুর চিন্তা, আবেগ ও কর্মের অভ্যাস গঠিত হয়। একটি শিশুর সুকোমল বৃত্তি ও সুপ্ত প্রতিভা পরিবারের মাধ্যমেই বিকাশ লাভ করে। শিশু পরিবার থেকে অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও গ্রহণ করে।

পরিবার থেকেই একটি শিশু আচার-আচরণ, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করে সমাজে একজন যোগ্য ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসাবে গড়ে ওঠে। সুতরাং, একটি শিশুর ব্যক্তিত্ব নির্ভর করে পরিবারের তিনটি বিষয়ের ওপর- মা-বাবার সম্পর্ক, মা-বাবা ও শিশুর মধ্যে সম্পর্ক, একই পরিবারের একাধিক শিশুদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। উল্লিখিত সম্পর্কগুলো যদি ইতিবাচক হয়, তবে শিশু সৎ, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে ওঠে এবং সমাজে সহজ জীবনযাপন করতে পারে। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার দ্বারা শিশুর পূর্ণ বিকাশও হয়ে থাকে।

পরিবার, বিশেষ করে বাবা-মা যেহেতু শিশুর সামাজিকীকরণের প্রথম স্থান; সেই পরিবারেই যদি উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা, ঝগড়া, দ্বন্দ্ব কাজ করে, তাহলে তার প্রভাব শিশুর ওপর পড়তে বাধ্য। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাকালে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবারে এখন উপরোক্ত সমস্যগুলো বিরাজমান। সুতরাং, শিশুর স্বাভাবিক যে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, করোনাকালে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

এ ছাড়া এ সময়ে যেসব নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, তারাও যথোপযুক্ত সামাজিকীকরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একমাত্র বাবা-মা ছাড়া অন্য কোনো আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে তাদের কোনো পরিচয় ঘটছে না এতে তারা পরিবারের অন্য সদস্যদের আবেগ-অনুভূতি ও স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজেই এদিক থেকে বলা যায়, নবজাতক শিশুর ক্ষেত্রেও সামাজিকীকরণ ব্যাহত হচ্ছে।

 ২. শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সামাজিকীকরণে তাদের সঙ্গী বা খেলার সাথীরা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে খেলার সঙ্গীদের সঙ্গে খেলাধুলার মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদান হয়; শারীরিক দক্ষতা গড়ে ওঠে, যা তাদের বলিষ্ঠ মনোবল গঠনে সহায়তা করে এবং নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি পরিস্ফুট হয়। সে স্বাবলম্বী হতে শেখে। কিন্তু করোনা সংক্রমণের ভয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে শিশু বা ছেলেমেয়েরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তারা আগের মতো একত্রে খেলাধুলা করা বা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজে যোগ দিতে পারছে না। এর ফলে তাদের যথাযথ সামাজিকীকরণে ব্যাঘাত ঘটছে।

৩. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো শিশুর সামাজিকীকরণের গুরুত্বপূর্ণ স্থান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক ভাব বিনিময় ও মিথস্ক্রিয়া হয় এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখে, যা তার সামাজিকীকরণে সহায়ক হয়। সমাজের সদস্য হিসাবে যাতে সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক আদর্শ, সামাজিক অভ্যাসগুলো আয়ত্ত্ব করতে পারে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ শিক্ষাই শিক্ষা দেয়। কিন্তু প্রায় দেড় বছরকাল ধরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এ সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে। ফলে ছাত্রছাত্রীদের মানসিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

৪. ধর্মীয় অনুশাসন মানুষের জীবন নানাভাবে প্রভাবিত করে। শৈশবকাল থেকে যে ব্যক্তি যে ধর্মে বিশ্বাসী, সে ব্যক্তি সেই ধর্মীয় মূল্যবোধের মাধ্যমে লালিত হয় এবং সেই ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যগুলো পরবর্তীকালে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে প্রতিফলিত হয়। ধর্ম মানুষকে সামাজিক মূল্যবোধ তথা সত্যবাদিতা, কর্তব্যপরায়ণতা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা প্রভৃতি গুণে গুণান্বিত হতে শিক্ষা দেয়। এক কথায়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু করোনাকালে অধিকাংশ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় এবং কোনো কোনো সময় করোনার দ্রুত বিস্তার রোধে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে বিধিনিষেধ আরোপ করায় এর প্রভাব ছেলেমেয়েদের ওপর পড়েছে, যা তাদের যথাযথ সামাজিকীকরণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।

৫. সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা লক্ষ করা যায়। গণমাধ্যম হলো সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ইত্যাদি। তবে এগুলো সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে গৌণ ভূমিকা পালন করে। গণমাধ্যম, বিশেষ করে টেলিভিশনে করোনা সংক্রান্ত খবর দেখে ও শুনে ছেলেমেয়েদের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ পড়ছে, যা তাদের প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতির মধ্যে রাখে এবং তাদের স্বাভাবিক সামাজিকীকরণে বাধা দিচ্ছে। তবে আশার কথা হলো- এই করোনাকালে গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র, কার্টুন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করে ছেলেমেয়েদের মনোবল দৃঢ় ও সতেজ রাখতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে।

করোনাকালে শিশু, কিশোর-কিশোরী ও ছাত্রছাত্রীরা অতিরিক্ত মাত্রায় ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভর খেলাধুলার কারণে তাদের স্বাভাবিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হচ্ছে। মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে বিভিন্ন ধরনের গেম খেলে তাদের মধ্যে গেমিং ডিসঅর্ডারও তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রাম অপেক্ষা শহরাঞ্চলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভর ক্রিয়াকলাপ বেশি। তাছাড়া পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় তারা ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভর খেলাধুলা বেশি করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব অনেক শিশুর মধ্যে দেখা যাচ্ছে। তারা আক্রমণাত্মক ও ক্ষিপ্ত স্বভাবের হয়ে পড়ছে। এসবই সামাজিকীকরণের চ্যালেঞ্জ হিসাবে ধরে নেওয়া যায়।

চলমান পরিস্থিতিতে সামাজিক জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনগুলাে উল্লেখ করবে: করোনা মহামারি শিশু, কিশোর-কিশোরী ও ছাত্রছাত্রীদের সামাজিকীকরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কতটুকু প্রভাব ফেলছে, তার গবেষণাভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত এখন পর্যন্ত আমাদের জানা নেই। তবে করোনাকালে একটা প্রজন্মের স্বাভাবিক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া যে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

ভয়, উদ্বেগ, অনিশ্চয়তা, অবিশ্বাস, যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব ইত্যাদি কারণে করোনা-উত্তর এ প্রজন্মের মানসিক ও সামাজিক ভারসাম্যহীন আচরণ যে আমাদের মোকাবিলা করতে হবে, সে বিষয়ে হয়তো কারও কোনো দ্বিমত নেই। বস্তুত করোনাকালে একটা প্রজন্মের ক্ষেত্রে যথাযথ সামাজিকীকরণের যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, তা কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে; সে বিষয়ে সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীদের এখনই মনোযোগ দিতে হবে বলে আমরা মনে করি।

বৈরী এ সময়ে বাবা-মাকে সন্তানদের বেশি করে সময় দেওয়া, ডিজিটাল ডিভাইসনির্ভরতা কমাতে বাড়ি বা ঘরের মধ্যেই যতটুকু সম্ভব তাদের অন্যান্য খেলাধুলায় নিয়োজিত করা, মজার কোনো গল্পের বই পড়া, ছড়া আবৃত্তি করা, ছবি আঁকা শেখানো, শিশুদের সঙ্গে একত্রে বসে শিশুদের উপযোগী কোনো চলচ্চিত্র দেখা, সংবাদপত্র পড়ানো, দেশ-বিদেশে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভাববিনিময় করানো (ভার্চুয়ালি), ছাদ বাগানে নিয়ে যাওয়া, আকাশ ও এর আশপাশের দৃশ্য উপভোগ করা, লুডু-ক্যারম খেলা বা পাজল মেলানো, সম্ভব হলে একই বিল্ডিংয়ে বসবাসরত শিশুদের নিয়ে মজার কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুদের মনোবল চাঙ্গা রাখা যেতে পারে। এর ফলে তাদের ভয়-ভীতি দূর হবে ও কিছুটা হলেও সামাজিকীকরণ হবে এবং এ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করা সহজ হবে বলে মনে করি।

এ বিষয়ে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণও নিজস্ব পর্যবেক্ষণ/ মতামত প্রদান করবো: করেনার সময় আমরা সঠিক ভাবে সামাজিকরন করতে পারি নি বলে আজ আমাদের দেশে করেনারর প্রভাবে নানা রকমের সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে নানা ভাবে।

উপসংহার:

ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রক্রিয়ায় সামাজিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে মানুষ একটি সামাজিক ব্যক্তি হয়ে ওঠে এবং ব্যক্তিত্ব অর্জন করে। সঠিক সামাজিকীকরণের মাধ্যমে একটি সমাজের মধ্যে অভিন্নতা দেখা দিতে পারে। একটি সমাজের লোকেরা যদি একই সামাজিকীকরণ পরিবেশ পায় তাহলে সেখানকার মানুষের একই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে বেড়ে ওঠে। মানুষ বিভিন্ন সামাজিক দল এবং বিভিন্ন সামাজিক পরিস্থিতিতে বাস করতে হয়। নিজের জীবনের নতুন পদ্ধতিতে সামঞ্জস্য করার জন্য মানুষ জীবনের কৌশলগুলি শিখতে হয়, আর সে কৌশলগুলো সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জন করে থাকে।

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াটি সারাজীবন বিদ্যমান থাকে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি শিশুকে সমাজের একজন দরকারী পরিপূর্ণ সদস্যে পরিণত করে এবং তাকে সামাজিক পরিপক্কতা প্রদান করে।

 

ভিডিও

 

About Post Author

Leave a Comment

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: