মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

নারীর ক্ষমতায়নের স্তম্ভ শেখ হাসিনা

 

নারীর ক্ষমতায়নের স্তম্ভ শেখ হাসিনা    :   বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন সপরিবারে শাহাদাত বরণ করেন, তখন তাঁর দুই কন্যাই দেশের বাইরে ছিলেন। শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী ডঃ ওয়াজেদ মিঞা তখন ছিলেন জার্মানির রাজধানী বন শহরে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা তথা ওয়াজেদ মিঞার পত্নী শেখ হাসিনা তখন তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ছিলেন সুদূর বন শহরে তাঁর স্বামীর কর্মস্থলে। ফলে ইতিহাসের নির্মমতম হত্যাকাণ্ডের কালে বাংলাদেশে না থাকার জন্যেই তিনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন

ছাত্র জীবনে আর দশটা বাঙালি মেয়ের যেটুকু রাজনৈতিক সংযোগ হয়, তার থেকে বেশি কিছু রাজনীতির সঙ্গে শেখ হাসিনা নিজে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। তবে বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে রাজনীতি ছিল তাঁর রক্তে। জন্ম থেকেই একটা সৎ, নির্ভীক, আত্মনিবেদিত সামাজিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। পিতা মুজিবকে পারিবারিক চৌহদ্দির ভিতরে পাওয়ার খুব সুযোগ তখন তাঁর ঘটত না। কারণ, হাসিনার কৈশোরকালটা জুড়েই তাঁর পিতা মুজিব হয় থাকতেন আন্দোলনের ময়দানে, নয়তো থাকতেন পাকিস্থানের জেলে। এই সময়কালটাতে হাসিনার সার্বিক জীবনবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর মা বেগম ফজিলতুন্নেছা মুজিবের ছিল ঐতিহাসিক অবদান।

মুজিব কন্যা হওয়ার কারণে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানে পড়াশোনা চালানোর কাজটি হাসিনার পক্ষে খুব সহজ হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের কাছে কোনোদিনই শেখ মুজিবুর রহমান, কোনও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিগণিত হতেন না। মুজিবকে এবং তাঁর পরিবারকে যে কোনও উপায়ে সমস্যায় ফেলতে পারলেই আইয়ুব-‌ইয়াহিয়া এবং তাদের বাঙালি সংস্করণেরা খুব বেশি রকমেরই আত্মতৃপ্তি খুঁজে পেতেন।

সেই কারণেই খুব ছোট থেকে শেখ হাসিনাকে নানা ধরণের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হত। শৈশবে তাঁকে যখন স্কুলে ভর্তি করা হবে, সেই সময়কালের উত্তাল গণ আন্দোলনের জেরে ঢাকার অনেক স্কুলই রীতিমতো ভয় পেতে থাকল মুজিব-‌কন্যাকে ভর্তি করতে। প্রায় প্রতিটি স্কুলের দুয়ারে দুয়ারে কন্যাকে নিয়ে ঘুরলেন বেগম ফজিলতুন্নেছা। স্কুল কর্তৃপক্ষগুলির মানসিকতা বুঝে একজন বার্তাবাহক মারফত গোটা বিষয়টা বেগম মুজিব জানালেন বঙ্গজননী সুফিয়া কামালকে। সুফিয়া কামালের উদ্যোগে হাসিনা ভর্তি হলেন লীলা নাগ প্রতিষ্ঠিত ‘‌নারী শিক্ষা মন্দির’‌ নামক স্কুলে। এটা সম্ভবত ১৯৫৮ সালের ঘটনা।

এই ধরণের নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে খুব ছোটবেলা থেকেই চলতে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রাজনৈতিক আবহাওয়াকে তিনি জোরদার ভাবেই আত্মসংকল্পে দৃঢ় হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর স্থিতধী বুদ্ধি, স্থৈর্য, মানসিক ঔদার্য এবং সহনশীলতাকে তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অত্যন্ত পছন্দ করতেন। তাই খুব তীব্র ভাবে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কন্যা না থাকলেও, ছয় দফা আন্দোলনের ক্ষেত্রে পিতাপুত্রীর গৃহাভ্যন্তরে যে আলাপ-‌আলোচনা, তা বঙ্গবন্ধুকে অনেকখানি ভাবনা চিন্তার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করতে সাহায্য করেছিল।

মুক্তিযুদ্ধের বন্দি নয় মাসে মা ফজিলতুন্নেছাকে যে ভাবে মানসিক সাহস দিয়েছিলেন তাঁর কন্যা হাসু, বঙ্গবাতা তাঁর সপ্রশংস উল্লেখ বার বার করেছেন। পাক হানাদারেরা নানা ছলছুতোয় মুক্তিযুদ্ধের কালে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে হত্যার চেষ্টা করেছে। নানা ভাবে এই পরিবারটির উপর সামাজিক, অর্থনৈতিক নির্যাতন চালিয়েছে। সবথেকে বেশি যেটি করেছে, সেটি হল মানসিক নির্যাতন।
স্বামী পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তিনি আদৌ জীবিত আছেন কিনা তার সঠিক তথ্য কিছুতেই জানতে পারছেন না বেগম মুজিব। দুই পুত্র জামাল আর কামালও যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছে। তাঁরা নিরাপদ আছে কিনা, এমনকী বেঁচে আছে কিনা সেটাও বুঝতে পারছেন না তিনি। শিশুপুত্র রাসেল আর দুই মেয়েকে নিয়ে কার্যত অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন বেগম মুজিব। অনেক সময়েই এমন হয়েছে, কেবলমাত্র চাল ছাড়া ঘরে খাবার জিনিস কিছু নেই। আনাজপাতি পর্যন্ত নেই।

এই গ্রহণকালে অত্যন্ত ধৈর্য আর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মায়ের পাশে ছিলেন শেখ হাসিনা। প্রায় দুধের সন্তান তাঁর নিজের পুত্র তখন। ভাই রাসেলেরই বা কত আর বয়স। পাক হানাদারদের মানসিক নির্যাতনে যাতে মা এতটুকু ভেঙে না পড়েন এটা দেখাই তখন প্রথম এবং প্রধান কাজ হয়েছিল হাসিনার। গোটা পরিবারটাকে সবদিক থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে বেঁধে রেখে পাক হানাদারদের মোকাবিলার ক্ষেত্রে সেদিন ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন শেখ হাসিনা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিন্তু কোনও অবস্থাতেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুর কাছাকাছি একটি বারের জন্যেও তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়নি। কোনও অবস্থাতেই মুজিবকন্যা হিসেবে নিজেকে জাহির করবার পথে একটি বারের জন্যেও হাসিনাকে হানটতে দেখা যায়নি। তিনি তখন ব্যস্ত থেকেছেন নিজের সংসার ঘিরে। স্বামী-পুত্র, কন্যাদের ঘিরেই তখন আবর্তিত হয়েছিল হাসিনার জীবন। তাই বলে জ্যেষ্ঠা কন্যার বুদ্ধিমত্তাকে, ভবিষতের প্রতি সুতীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিকে একদিনের জন্যেও অমর্যাদা করেননি তাঁর পিতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। স্নেহের হাসু তাঁকে যেসব বিশ্লেষণী ভাবনা দিতেন, সেই সবকটি ভাবনার প্রতিই বঙ্গবন্ধুর ছিল সজাগ দৃষ্টি। কন্যার বিশ্লেষণকে তিনি অন্য অনেকের থেকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। মর্যাদা দিতেন। তাই কন্যার মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধু তাঁর নিজের ভাবনা চিন্তাকে পুনর্গঠিত করতেন। তা বলে এইটা ভাববার কোনও কারণ নেই যে, সংবিধান বহির্ভূত কোনও ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন হাসিনা। কিংবা পিতার কন্যা স্নেহের সুযোগ তিনি নিয়েছেন। অত্যন্ত স্থিতধী বুদ্ধির ভিতর দিয়ে দেশের ভাল এবং দেশের মানুষদের ভালর জন্যে তিনি প্রয়োজনে সরকারি নিয়ম নীতির ক্ষেত্রেও কোনটা বেশি ইতিবাচক হতে পারে সেই কথাও দ্বিধাহীন চিত্তে বঙ্গবন্ধুকে বলবার সাহস রাখতেন।

সুসুপ্তিতে শয়ান এক আগ্নেয়গিরি যে শেখ হাসিনা, তার পরিচয় মানবসমাজ পেল বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে শহিদ হওয়ার পর। একরাতে এক সঙ্গে বাবা-মা-ভাই-ভাতৃবধু , এমনকী দশ বছরের ভাই শেখ রাসেল, ঘাতকেরা যখন তাঁর দিকে বন্দুক উঁচিয়েছে, সে তখনও জানে না, কী ঘটতে চলেছে। কেবল কাতর স্বরে শিশুটি তখন বলে চলেছে; আমি হাসু আপার কাছে যাব। আমাকে হাসু আপার কাছে নিয়ে চল।

এই কঠিনতম শোককে বুকে পাথরের মতো চেপে যে ভাবে সংকল্পে দৃঢ় থেকে বাংলাদেশ ঘিরে ইতিহাসের রথচক্রকে উল্টোদিকে ঘোরাবার প্রয়াসকে প্রতিহত করেছেন শেখ হাসিনা, গোটা বিশ্বে এমন লৌহকঠিন অথচ স্নেহমমতায় অবিকল মাতৃমুর্তির প্রতিবিম্ব স্বরূপ আর একটা শেখ হাসিনাকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। পিতার শাহাদাতের পর দিল্লিতে যখন ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে তিনি সপরিবারে ছিলেন, সেই সময়কালটাতে যথেষ্ট আর্থিক কষ্টের ভিতরেই তাঁকে জীবন কাটাতে হয়েছিল। ’‌৮০ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধী ফিরে আসার পর হাসিনার দিল্লি প্রবাস জীবনে কিছুটা হলেও নিশ্চিন্ততা ফেরে। শ্রীমতী গান্ধী এবং প্রণব মুখার্জি হাসিনা পরিবারটির প্রতি চিরদিনই অত্যন্ত ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে চলেছিলেন। তবে তার আগে মোরারজি দেশাইয়ের সরকার তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এইকথা জোর দিয়ে বলা যায় না। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে যে খুনি মেজরচক্র বাংলাদেশে ক্ষমতাদখল করেছিল, সেই খুনি শাসকদের প্রতি কুটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশাই সরকার খানিকটা পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণ ই করেছিল।

দেশাই সরকারের বিদেশমন্ত্রী হিসেবে অটলবিহারী বাজপেয়ী সেইসময়ের বাংলাদেশের শাসক, যারা প্রত্যক্ষ ভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত, তাদের সঙ্গে যে সম্পর্কের বাতাফরণ তৈরি করেছিলেন, সেটি নিঃসন্দেহে বাজপেয়ীদের হিন্দু সাম্প্রদায়িক মানসিকতা কে উঠে আসা।সেই মানসিকতার ফলে ভারত সরকার ’‌৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি যে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা নিয়ে চলেছিল, সেখান থেকে সরে এসে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী, পাক হানাদারদের সমর্থনকারীদের প্রতি সহাধুভূতির মানসিকতাই দেশাই সরকারের ভিতর তীব্র হয়ে উঠেছিল। এটা আমাদের কাছে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, বামপন্থীরা সেদিন দেশাই সরকারের সমর্থক হয়েও সেই সরকারের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী, বঙ্গবন্ধুর খুনে সরাসরি যুক্ত লোকেদের দ্বারা পরিচালিত সরকার সম্পর্কে দেশাই সরকারের মনোভাবের বিরোধিতা করেনি।

About Post Author

Leave a Comment

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: