নায়ক রিয়াজের শ্বশুর ফেসবুক লাইভে আত্মঘাতী

নায়ক রিয়াজের শ্বশুর ফেসবুক লাইভে আত্মঘাতী

 

নায়ক রিয়াজের শ্বশুর ফেসবুক লাইভে আত্মঘাতী   :   ফেসবুক লাইভে এসে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন চিত্রনায়ক রিয়াজের শ্বশুর মোহাম্মদ আবু মহসিন খান। গতকাল বুধবার রাত সোয়া ৯টার দিকে ধানমন্ডির ৭ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর ভবনে নিজ ফ্ল্যাটে তিনি আত্মহত্যা করেন। এর আগে তিনি চিরকুট লিখে দরজায় স্কচটেপ দিয়ে আটকে যান। তাতে লেখা ছিল- ‘মামা দরজা খোলা, হাতলের হ্যান্ডেল চাপ দিয়ে ভেতরে ঢুকো।

মৃত্যুর আগে আবু মহসিন লাইভে বলেন, ‘আমি মহসিন। ঢাকায় থাকি। আমার বয়স ৫৮ বছর। কোনো এক সময়ে আমি ভালো ব্যবসায়ী ছিলাম। বর্তমানে আমি ক্যানসারে আক্রান্ত। তাই আমার ব্যবসা কিংবা কোনো কিছুই নেই। ভিডিও লাইভে আসার উদ্দেশ্য হলো, মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং আমার যে এক্সপেরিয়েন্স, সেটা শেয়ার করলে হয় তো সবাই জানতে পারবে, সবাই সাবধানতা অবলম্বন করবে। গত ৩০ তারিখ আমার খালা মারা যান। তার একটি ছেলে আমেরিকায় থাকে, মা মারা গেল অথচ ছেলেটি আসল না। এটা আমাকে অনেক দুঃখ দিয়েছে। কষ্ট লেগেছে।

আজকে আমার আরেকজন খালা মারা গিয়েছেন। তারও একটি ছেলে আমেরিকায় ছিল। অবশ্য তার তিনটা ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। তিনজনই বর্তমানে বাংলাদেশে আছেন। তারা হয়তো দাফন-কাফনের কাজ সম্পন্ন করছে। সেদিক দিয়ে বলব, এই খালা অনেকটা লাকি। আমার একটা মাত্র ছেলে। সে অস্ট্রেলিয়াতে থাকে। আমার বাসায় আমি সম্পূর্ণ একা থাকি। আমার খালা মারা যাওয়ার পর থেকে আমার ভেতরে খুব ভয় করছে। আমি যদি আমার বাসায় মরে পড়েও থাকি, আমার মনে হয় না যে, এক সপ্তাহ কেউ জানতে পারবে, আমি মারা গেছি। ছেলেমেয়ে স্ত্রী যাদের জন্য যাই কিছু আমরা করি। আমরা সব কিছু করি সন্তান এবং ফ্যামিলির জন্য। আপনি যদি একশ টাকা ইনকাম করেন, আয় করেন, তার টোয়েন্টি পারসেন্ট টাকাও আপনি নিজের জন্য ব্যয় করেন না। যদি টোয়েন্টি পারসেন্ট টাকা আপনি নিজের জন্য ব্যয় করেন, তা হলে ৮০ পারসেন্ট টাকা আপনার ফ্যামিলির জন্য ব্যয় হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত করোনা শুরুর আগ থেকে আমি বাংলাদেশে আছি। একা থাকা যে কী কষ্ট, যারা একা থাকে, তারাই একমাত্র বলতে পারে বা বোঝেন। যাদের জন্য আমি বেশি করেছি, প্রত্যেকটা লোকের কাছে আমি প্রতারিত হয়েছি। আমার এক বন্ধু ছিল, নাম কামরুজ্জামান বাবলু। যাকে আমি না খেয়ে তাকে খাইয়েছি। সে আমার ২৩ থেকে ২৫ লাখ টাকা মেরে দিয়েছে। এভাবে আমি বিভিন্ন মানুষের কাছে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকার মতো পাই। সবশেষ আমি নোবেল নামে একজনকে বিশ্বাস করি। যাকে আমি মিনারেল ওয়াটার প্ল্যান্টের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু দুই বছরেও সেই প্ল্যান্টের যন্ত্র সে কেনেনি। পরে তার কাছে টাকা ফেরত চাইলে, ঝগড়া হয়। এর পর সে দুই দফায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দেয়। বাকি টাকা সে আমাকে দিচ্ছে না। মানুষ কেন এত লোভী হয়?’

এর পর আবু মহসিন পিস্তলের লাইসেন্স দেখিয়ে বলেন, ‘আমি যেটা দিয়ে আত্মহত্যা করছি সেটি ইলিগ্যাল কিছু না। এটির লাইসেন্স আছে। সেটি নবায়নও করা হয়েছে। আমি চলে যাব। আত্মীয়স্বজন যারা আছ, যেহেতু বাবাও আমাকে জায়গাটা দেয়নি, আমি যে কবরস্থানটা করেছি সেখানে আমাকে দাফন করো না। মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে একটি কবরস্থান হয়েছে, সেখানে তোমরা আমাকে দাফন করে দিও। প্রত্যেকটা লোক আমার সাথে প্রতারণা করেছে। আমার বাবা, মা, ভাইরা, প্রত্যেকটা লোক, এভরিওয়ান।’

লাইভে কথা বলার সময় সামনের টেবিলে কাফনের কাপড় ছিল। এর ওপর রাখা একটি চিরকুটে লেখা ছিল, ‘এখানে কাফনের কাপড় রাখা আছে। যা আমি ওমরা হজে ব্যবহার করেছিলাম।’ যারা দেখছেন, তাদের সাথে এটাই শেষ দেখা। সবাই ভালো থাকবেন।’ এভাবে ১৬ মিনিটি কথা বলে কালেমা পড়ে একপর্যায়ে নিজের মাথায় গুলি করেন তিনি।

ধানমন্ডি থানার ওসি ইকরাম আলী মিয়া জানান, আবু মহসিন খানের স্ত্রী ও সন্তান অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। নিহতের ফলোয়াররা নৃশংস এই দৃশ্য দেখে ঘটনাটি তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে জানান। খবর পেয়ে পুলিশ ধানমন্ডি ওই বাড়ির পঞ্চম তলা থেকে মহসিনের মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় ওই ফ্ল্যাটে কেউ ছিল না।

এর আগে বুধবার রাত সোয়া ৯টার দিকে ফেসবুক লাইভে আসেন আবু মহসিন খান। নিজেকে ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীটা সুন্দর। আমি হয়তো দুই দিন পরে যেতাম। কিন্তু আত্মীয়স্বজনরা সবাই আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে।’ এর পর কালিমা পড়েন এবং সন্তানদের কাছে ক্ষমা চান।

ওসি ইকরাম আলী মিয়া জানান, প্রস্তুতি নিয়েই আবু মহসিন আত্মহত্যা করেছেন। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন, ব্যবসা করতেন এবং লোকসানের ভারে কীভাবে জর্জরিত হয়েছেন সব কিছুই তিনি চিরকুটে লিখেছেন। তার পরও পুলিশ বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। সিআইডির ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

About Post Author

Leave a Comment

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: