মাতৃভাষা মাতৃ দুগ্ধ সম

মাতৃভাষা মাতৃ দুগ্ধ সম

 

মাতৃভাষা মাতৃ দুগ্ধ সম   :   উনিশ শতকের কোনো বাংলা জার্নাল যে ভাষায় প্রকাশিত, আজকের কোনো দৈনিক বা সাময়িকীর ভাষার সঙ্গে তার কত অমিল। মানুষের ভাষার অন্যতম প্রধান দলিল সাহিত্য, সেই সাহিত্যের ভাষাও কতভাবে বদলে যাচ্ছে।

সেকালের কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যে ভাষায় লিখে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, একালের কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন যে ভাষায় লিখে, দুজনেই বাংলা ভাষায় লিখেছেন বটে তবু দুজনের ভাষাই একইরকম, তা কি বলা যাবে? ভাষা নিজেই সময়ের বাঁকে বাঁকে বদলে গেছে। ভাষা মুখে মুখে ছড়ায়, কালে কালে তার ভঙ্গি পাল্টায়। ১৮৯৯ সালে বাংলায় জন্মগ্রহণ করা দুটি শিশু বড় হতে হতে একদিন কবি হয়ে ওঠেন। একজন বর্ধমানের আসানসোলের চুরুলিয়াতে, একজন বরিশালে। একজন কাজী নজরুল ইসলাম, আরেকজন জীবনানন্দ দাশ

লেখালেখিতে নজরুলের আত্মপ্রকাশ গত শতকের বিশের দশকেই, জীবনানন্দকে পাওয়া যায় ত্রিশের দশকে গিয়ে। জীবনানন্দ লেখালেখির শুরুর দিকে ভাষা-ছন্দে ঈষৎ নজরুল-আক্রান্ত ছিলেন বটে, কিন্তু ক্রমেই দাশ চিত্রিত করলেন এমন এক ভাষা, যে রকম ভাষাভঙ্গির কবিতা বাঙালি পাঠক আগে পড়েনি। অর্থাৎ একই বছরের জাতক দুজন কবির কবিতাও কত আলাদা আলাদা হট্যাঁ থাকে। যেভাবে একজন গ্রামীণ কৃষকের মুখের ভাষা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মুখের ভাষা এক নয়। সেখানে ভাষার কৌলীন্য বলে একটা বিষয় আমাদের মুখোমুখি চলে আসে। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব প্রতিভাত হয়। তাই গ্রামীণ কবিয়ালের ভাষা ও ‘আধুনিক কবি’র ভাষার মধ্যে একটা শ্রেণিগত বৈষম্য বিরাজ করে।

গ্রামের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা যেভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলে, শহরের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের ভাষা ব্যবহারের ভঙ্গি আলাদা হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে ভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা এক ধরনের সূক্ষ্ম লড়াই জারি হয়ে থাকে। আর নিরক্ষরজনের মুখের ভাষাতে তো কোনো রচনা ছাপাই হয় না, হলে ভাষার আরও কত বৈচিত্র্য না আমরা পেতে পারতাম। কিন্তু বিধান-ব্যবস্থাই এমন যে, শুধু লেখাপড়া লোকদের ভাষাই ছাপা হয়ে থাকে। নিরক্ষরজনের ভাষা যে একদম ছাপাখানায় যায় না, তা নয়। তবে সেটি এখন পর্যন্ত পাওয়া যায় নাটক বা সিনেমায়, কোনো নিরক্ষর চরিত্রের সংলাপে। কবিয়ালরাণও গ্রামীণ পর্যায়ের একটা চলনসই ভাষাতেই উপস্থাপিত হয়ে এসেছেন। অথচ ভাষা শুধু বর্ণমালাতেই প্রকাশিত নয়, ভাষা ব্যক্ত নয় শুধু মুখেই।

ভাষা ব্যক্ত শারীরিকভাবেও, ইংরেজিতে যাকে বলে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। একজন সরকারি বড় কর্তার হাঁটাচলা ও একজন কেরানির হাঁটাচলার ভাষা কত আলাদা। ভাষা বর্ণমালার বাইরেও তার অস্তিত্ব প্রকাশ করে চলে। ফলত, ভাষার লড়াই শুধু একটি ঐতিহাসিক শহীদী ঘটনা বা কোনো দিবস উদযাপনেই সীমিত থেকে যায় না, ভাষার লড়াই জারি থাকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাং¯ৃ‹তিক লড়াইয়ের অংশ হয়ে। লড়াই জারি আছে, লড়াই চলছে।

শুধু লড়াই জারি আছে বলাটাও একপেশে একটা মত। সন্ধিও আছে কোথাও কোথাও। ঔপনিবেশিক হেজিমনির সঙ্গে লড়াই আছে ভাষার, কোথাও সন্ধিতে হয়েছে ঐকতান, কোথাও লড়াই বিরাজমান। যে কারণে আঞ্চলিক একসেন্ট থেকে বের হয়ে ‘শুদ্ধ বাংলা’ প্রয়োগের গুরুত্ব আরোপ করা আছে। এই দায়িত্বে প্রায় সব গণমাধ্যমই অন্তর্ভুক্ত হবে। এই ‘শুদ্ধ’ প্রয়োগের বাধ্যবাধকতায় বৈচিত্র্যময় বাংলা ভাষার কত ঐশ্বর্যই যে, বিলীন হয়ে গেছে সন্দেহাতীতভাবে। যদি তাই হয়, তা হলে একদা মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে জীবনপাত করা বাঙালির অর্জন কি বিসর্জনে ধাবিত হয় না?

এ পর্যন্ত অর্জিত ভাষাকে পর্যাপ্ত ধরে রাখতে না পারা নিশ্চয়ই গৌরবের কিছু হতে পারে না! ভাষা আন্দোলনের পর প্রায় সত্তর বছর পার হতে চলল। লড়াইয়ের সেই দিনের ইতিহাস একটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে এসেছে। প্রতিবছর ঘটা করে সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির চেয়ে ভাষার বৈচিত্র্য ধরে রাখার প্রয়াসই কি আজ বেশি জরুরি নয়? পৃথিবীর মানুষের সব ভাষাই সুন্দর, অবশ্যই অর্জন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা রক্ষা যেমন জরুরি, জরুরি আদিবাসীদের ভাষাগুলোও ধরে রাখা। বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে রক্ষার চেতনা কি পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষা বিলুপ্তির কথা বলে? শাসকবর্গের তলোয়ার-বন্দুক যেন আর কোনো ভাষাকে অপমান করতে না পারে, সেদিকে নজর আনতে হবে আজ।

বাংলার গ্রামীণ জনপদের মানুষের পরম্পরায় অর্জিত ভাষা যেন শহরের ‘শুদ্ধ’ ভাষার আধিপত্যে বিলীন না হয়ে যায়, কম সম্মান যেন না পায়, সেদিকে লক্ষ করার দিন এসে গেছে। কেননা এতকাল তাই করা হয়েছে। এতে করে আমাদের ক্ষতিই যে হয়েছে, সেটা যেন আজ উপলব্ধি করতে পারি আমরা। সেই উপলব্ধিতেই আমরা সমৃদ্ধ হতে পারি।

আমরা দেখেছি, এই জনপদের প্রাচীন বাসিন্দা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ভাষা ধরে রাখা হয়নি। নিম্নআয়ের প্রায় সব জনগোষ্ঠীর ভাষাই বিলুপ্তির দিকে। ভাষার প্রধান দায়িত্ব যোগাযোগ, তা হলে কত মানুষের যোগাযোগ মাধ্যম কত ভাষাকে আমরা আলাদা করে আমলে না নিয়ে সব সময় শুধু সমাজের উপরতলা থেকে চাপিয়ে দেওয়া ভাষার দিকে তাকিয়ে ছুটেছি, ছুটছি! অর্থনৈতিক বাস্তবতার ফাঁদে ফেলে উপনিবেশজাত ইংরেজির যে গুরুত্ব, বাংলা ভাষার জন্য রাস্তায় মানুষের প্রাণ দেওয়া এই দেশেই বাংলা ভাষা কি সেই গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়েছে বা পাচ্ছে? আবার শহরের বাংলা ভাষার কাছে গ্রামীণ লোকভাষা কি সমান গুরুত্বের হয়ে উঠতে পারছে?

১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে প্রাণ গেল বাঙালির, নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষার যে অফিসিয়াল দাপট, তা বাংলা ভাষার চেয়ে বেশি। ইংরেজি ভাষার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চাকরিজীবীরা বেতন পেয়ে থাকেন। এমনকি অর্থনৈতিক ক্ষমতায় ইংরেজি প্রভাবশালী। সামাজিকভাবে মানসম্মান বেশি ইংরেজি ভাষা জানা মানুষের। উচ্চ আদালতের রায়ের ভাষা এখনো ইংরেজি। সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের পারস্পরিক ভাষা ইংরেজি। ফার্মেসির সব ওষুধের নাম ইংরেজি, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন হয় ইংরেজিতে। প্রেসক্রিপশন শব্দটাও ইংরেজি। তা হলে বাংলা ভাষা কি সর্বত্র ব্যবহৃত হচ্ছে? ভাষা আন্দোলনে রক্ত ঢেলে পৃথিবীতে ইতিহাস হয়ে গেলাম আমরা, আবার আমরাই ব্রিটিশ উপনিবেশের হ্যাংওভার থেকে বেরোতে পারলাম না। হ্যাংওভার শব্দটিও ইংরেজি।

কবি শঙ্খ ঘোষ ‘হ্যাংওভার’ শব্দটির একটা বাংলা নাম দিয়েছেন, ‘ঝুলনমায়া’। আমাদের কলোনিমনস্ক ঝুলনমায়া কাটবে কবে? আদৌ কাটবে? আসামের বরাক উপত্যকার শিলচরে ১৯৬১ বাংলা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন নারী-পুরুষ বাঙালি। দুর্ভাগ্য, আসামে আজও বাংলা ও বাংলা ভাষা হুমকির মুখে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার কবি হিসেবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ১৯১৩ সালে। তারও আগে মধুসূদন দত্ত ইংরেজি ভাষায় কবিতা লেখা ছেড়ে ফিরে এসেছেন বাংলা ভাষায়। বাংলা ভাষার গান, কবিতা, সাহিত্যের সমৃদ্ধিকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আবার বাংলা ভাষারও সুযোগ নেই অন্য কোনো ভাষাকে ছোট করে দেখার। তা সেই ভাষার বর্ণমালা থাকুক আর নাই থাকুক। যেমন আমাদের আদিবাসীদের ভাষা। সামাজিক সাম্যের মতো ভাষাধিপত্যেও সাম্যতা নিশ্চিত প্রয়োজন। উপরতলা যেন নিচের তলাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে হটিয়ে না দেয়।

ভাষা গবেষণা ও সংরক্ষণে এসবের গুরুত্ব আনতে হবে। প্রত্যেক বছর ২১ ফেব্রুয়ারির লড়াই ও শোকের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতেই যেন আমরা আটকে না থাকি। পৃথিবীতে অর্জিত মানুষের ভাষাকে ধরে রাখতে হবে। বিবৃতি-সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্যকে বিস্তৃতি দিতে হবে। তবেই না বাঙময় অনুভূতি প্রকাশ পাবে বর্ণমালায়। সেই বর্ণমালা যে ভাষারই হোক। মানুষের অর্জিত ভাষাই যদি আমরা ধরে রাখতে না পারি, আমরা ফসলের মাঠের ভাষা, বহতা নদীর ভাষা কীভাবে ধরতে পারব? দুপুরের নির্জন বনভূমির ভাষা আছে না? পাহাড়ের স্তব্ধতা ডাক না দিলে কি আমরা দল বেঁধে উপত্যকায় উঠতাম? ফুলে ফুলে ভ্রমর যে গুনগুন করে যায়, ভ্রমরের ভাষা কী? সমুদ্র কল্লোল তুলে কী বলতে চায় মানুষের কানে? আর পাখি, পাখিদের ভাষা নিয়ে ভাবব না আমরা? কাক ডাক দিলে কাক সাড়া দেয়, কোকিল ডাক দিলে কোকিল সাড়া দেয়, যে পাখিই ডাকুক তার স্বগোত্রের পাখি ঠিকই টের পায়। কেন টের পায়? কারণ, পাখিদেরও মাতৃভাষা আছে।

টোকন ঠাকুর : কবি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

About Post Author

Leave a Comment

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: